সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রয়োজনীয় জনবল, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি আইনগত প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং উপযুক্ত কিডনি দাতার সংকট এর অন্যতম কারণ।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে কিডনি রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য ২০০১ সালে এনআইকেডিইউ প্রতিষ্ঠা করে সরকার। দুই বছর পর, ২০০৩ সালে ১০০ শয্যায় রোগী ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১২ সালে শয্যাসংখ্যা বাড়িয়ে ১৫০ করা হয়। পরে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে তা ৩০০ শয্যায় উন্নীত হয়।
পরবর্তীতে ৫০০ শয্যার প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন মিললেও সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জনবল দেওয়া হয়নি। বর্তমানে ৪৫০ শয্যায় রোগী ভর্তি করা হলেও প্রতিষ্ঠানটি কার্যত ১৫০ শয্যার জনবলকাঠামো দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে।
‘আজকের পত্রিকা’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এনআইকেডিইউতে কিডনি প্রতিস্থাপন শুরু হয় ২০০৫ সালে। ২০০৮ সালে চারটি, ২০০৯ সালে আটটি, ২০১০ সালে চারটি, ২০১১ সালে পাঁচটি, ২০১২ ও ২০১৩ সালে তিনটি করে এবং ২০১৪ ও ২০১৫ সালে একটি করে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়।
এরপর টানা পাঁচ বছর বন্ধ ছিল প্রতিস্থাপন কার্যক্রম। ২০২১ সালে পুনরায় কার্যক্রম শুরু হলে ওই বছর তিনটি, ২০২২ সালে পাঁচটি, ২০২৩ সালে ১১টি, ২০২৪ সালে আটটি, ২০২৫ সালে ১৭টি এবং চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ১২টি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে এখন পর্যন্ত ৮৬টি কিডনি প্রতিস্থাপন হয়েছে।
এনআইকেডিইউর কিডনি প্রতিস্থাপন প্রধান সমন্বয়কারী ও ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. ফজল নাসের বলেন, কিডনি প্রতিস্থাপন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও একাধিক ধাপের প্রক্রিয়া। এর মধ্যে দাতা ও গ্রহীতার ম্যাচিংসহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই করতে হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের পর দীর্ঘ সময় প্রতিস্থাপন কার্যক্রম প্রায় বন্ধ ছিল। ২০২১ সালে এটি আবার চালু হয়। বর্তমানে অনেক রোগী কিডনি প্রতিস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ২০ জনের আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
অধ্যাপক ফজল নাসের জানান, বর্তমান জনবল, সার্জন এবং অন্যান্য লজিস্টিক সুবিধা বিবেচনায় আইনগত প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা গেলে সপ্তাহে দুটি করে কিডনি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। সে হিসাবে বছরে প্রায় ১০০টি প্রতিস্থাপনের সক্ষমতা রয়েছে এনআইকেডিইউর।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিস্থাপনের আগে দাতা ও গ্রহীতার সম্পর্ক এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র একাধিক ধাপে যাচাই করা হয়। প্রথমে পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হয়। এরপর আইনগত কমিটি সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করে অনুমোদন দেয়।
এই কমিটিতে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়, জেলা প্রশাসন, পুলিশ এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। পাশাপাশি দাতার শারীরিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকিও পরীক্ষা করা হয়।
জনবল সংকট
৫০০ শয্যার অনুমোদন থাকলেও এনআইকেডিইউতে সেই অনুযায়ী জনবল নেই। বর্তমানে ৪৫০ শয্যায় রোগী ভর্তি হলেও ১৫০ শয্যার জনবলকাঠামো অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে।
এই কাঠামোতে চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য কর্মীর অনুমোদিত পদ প্রায় ৬৫০টি। এর মধ্যে প্রায় ১০০ পদ এখনো শূন্য। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হিসাবে, পূর্ণাঙ্গ ৫০০ শয্যার হাসপাতাল পরিচালনার জন্য প্রায় পৌনে তিন হাজার জনবল প্রয়োজন।
হাসপাতাল ভবনটি চারতলা থেকে সম্প্রসারণ করে আটতলা করা হয়েছে। পঞ্চম তলায় ১০ শয্যার রেনাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আরআইসিইউ) স্থাপন করা হলেও জনবল সংকটের কারণে বর্তমানে পাঁচটি শয্যা চালু রাখা হয়েছে।
কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ টিস্যু ক্রস-ম্যাচিং এবং হিউম্যান লিউকোসাইট অ্যান্টিজেন (এইচএলএ) টাইপিং পরীক্ষার সুবিধাও এনআইকেডিইউতে নেই। ফলে রোগীদের এসব পরীক্ষা করাতে অন্য প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়।
এনআইকেডিইউর ইউরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. আব্দুল আলীম বলেন, ‘ইউরোলজি ও নেফ্রোলজির সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও দীর্ঘদিন বিভিন্ন কারণে তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। আগে সীমিতসংখ্যক নিকটাত্মীয় কিডনি দান করতে পারতেন। পরে আইন সংশোধন করে দাতার পরিধি বাড়ানো হয়েছে। এতে প্রতিস্থাপনের সুযোগও বাড়ছে। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে সপ্তাহে দুটি কিডনি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হবে।’
প্রতিষ্ঠানের ওপর বাড়তি চাপ
কিডনি প্রতিস্থাপনের পাশাপাশি এনআইকেডিইউতে কিডনি, মূত্রনালি, মূত্রথলি ও প্রোস্টেটের জটিল অস্ত্রোপচারও নিয়মিত করা হয়। ইউরোলজি বিভাগ জানিয়েছে, প্রতিদিন সেখানে ২৫ থেকে ৩০টি ছোট-বড় অস্ত্রোপচার হয়।
ইউরোলজি বিভাগের প্রায় ৯৫ শতাংশ অস্ত্রোপচার মিনিমালি ইনভেসিভ, ল্যাপারোস্কোপিক ও এন্ডোস্কোপিক পদ্ধতিতে সম্পন্ন করা হয়। তবে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। এরই মধ্যে রোবোটিক সার্জারি সিস্টেম স্থাপনের জন্য আবেদন করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত বছর এনআইকেডিইউর বহির্বিভাগে দুই লাখ পাঁচ হাজার রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। জরুরি সেবা নিয়েছেন প্রায় ১৫ হাজার এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন সাড়ে ১৩ হাজার রোগী।
একই বছরে ৩৬৬ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। বছরজুড়ে বড় অস্ত্রোপচার হয়েছে দুই হাজার ১৭৬টি এবং ছোট অস্ত্রোপচার হয়েছে দুই হাজার ৯৮২টি। অনুমোদিত শয্যার তুলনায় রোগী ভর্তির হার ছিল ১১৯ শতাংশ। হাসপাতালে একজন রোগীর গড় অবস্থানকাল ছিল ১১ দিন।
চাহিদার তুলনায় সক্ষমতা সীমিত
এনআইকেডিইউর ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে আক্রান্ত। তাদের মধ্যে প্রতি বছর ৩৫ থেকে ৪০ হাজার রোগী রোগটির শেষ পর্যায়ে পৌঁছান। তখন তাদের ডায়ালাইসিস অথবা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়।
এত বিপুল সংখ্যক রোগীর তুলনায় দেশে কিডনি প্রতিস্থাপনের সক্ষমতা এখনো অত্যন্ত সীমিত।
এনআইকেডিইউর পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ রাশেদ আনোয়ার বলেন, নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি সাধ্যমতো কাজ করছে। করোনা মহামারির কারণে দীর্ঘ সময় কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল। পাশাপাশি আইনগত প্রক্রিয়াটিও গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত কোনো জটিলতা ছাড়াই ৮৬টি সফল কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘লিভিং রিলেটেড ট্রান্সপ্লান্টে ডোনার পাওয়া কঠিন। নতুন আইনে ইমোশনাল ডোনারের সুযোগ যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি কিছুটা সহজ হয়েছে। তবে ডোনারের প্রাপ্যতা, শারীরিক সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি যাচাই করতে হয়। কিডনি রোগীদের অন্যান্য জটিলতার বিশেষায়িত সেবার সমন্বয়ও প্রয়োজন।’
নিউজ বাংলা চ্যানেল