নিউজ বাংলা ডেস্ক : বর্তমান সরকারের প্রথম ১৮০ দিন শিক্ষা খাতে কেটেছে একদিকে নানা আন্দোলন ও বিতর্কে, অন্যদিকে সংস্কার ও উন্নয়নের একাধিক উদ্যোগে। বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা, শিক্ষক বদলি, প্রশ্নপত্রের ভুলসহ বিভিন্ন ইস্যুতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উত্তপ্ত হয়েছে ক্যাম্পাস ও রাজপথ।
এ সময়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি, নকল ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ, আবাসিক হলে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং ১৯ বছরের মধ্যে এসএসসিতে সর্বনিম্ন পাসের হার নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। এর পাশাপাশি শিক্ষা খাতের উন্নয়ন ও সংস্কারে সরকারের অন্তত তিন ডজন দৃশ্যমান উদ্যোগও সামনে এসেছে।
শিক্ষার ক্ষেত্রে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন, বরাদ্দ বাড়ানো, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর কল্যাণ, প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান, কর্মমুখী শিক্ষা, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সুযোগ সম্প্রসারণ, ঝরে পড়া কমানো, নকল প্রতিরোধ, প্রণোদনা ও গবেষণাকে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে এসব উদ্যোগের অনেকগুলো এখনো পরিকল্পনা, অনুমোদন কিংবা পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষায় জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বরাদ্দ হয়েছে ২ শতাংশ। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষাবিদদের সমালোচনা রয়েছে। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী দুই বছরের মধ্যে শিক্ষায় বরাদ্দ ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচির আওতায় পাঁচ বছরে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৭৮ শিক্ষককে ট্যাব দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি ২৩ হাজার ৯৯৩ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত পাঁচটি করে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইতোমধ্যে ৩২টি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই চালু হয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ‘এডু-আইডি’।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য চতুর্থ শ্রেণিতে ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ এবং ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ নামে নতুন বই তৈরির কাজ চলছে। তৃতীয় ভাষা শেখানোর জন্য পাঠ্যক্রম প্রণয়ন এবং বিভাগ পর্যায়ে ভাষা গবেষণাগার স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির শারীরিক শিক্ষা বইয়ে যুক্ত করা হয়েছে সাতটি খেলা।
উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের এক লাখ শিক্ষককে পেশাগত উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। গত পাঁচ মাসে এরই মধ্যে ১ হাজার ৫৫৮ শিক্ষক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য পৃথক বদলি নীতিমালাও করা হয়েছে।
দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যন্ত প্রায় ৬৪ লাখ শিক্ষার্থীকে প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা উপবৃত্তি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিনামূল্যে স্কুল পোশাক ও দুপুরের খাবার দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। দুর্গম এলাকায় আবাসন সুবিধাসহ বিদ্যালয় নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে।
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রথম থেকে নবম শ্রেণির ৮১ বিষয়ের ৬ হাজার ৪৮২ কপি বই ব্রেইলে মুদ্রণের কাজ চলছে। গত পাঁচ মাসে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৩০০টি র্যাম্প এবং ২৫৫টি প্রতিবন্ধীবান্ধব শৌচাগার নির্মাণ করা হয়েছে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য জাতীয় একাডেমির পূর্ণাঙ্গ ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া ১০টি দুর্গম উপজেলায় নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের একটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণে ১৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈশ্বিক গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। গত পাঁচ মাসে ১৮০টি গবেষণার জন্য ৬৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আরও ২০০টি প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য বাছাই প্রক্রিয়া চলছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চট্টগ্রাম, রংপুর ও বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রকল্পও চলমান। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে জনবল নিয়োগের পাশাপাশি আইন যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর ৫ শতাংশ কমেছে।
৬০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের চাকরির উপযোগী করে তোলা এবং নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হল নির্মাণ ও সংস্কার এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য নির্দেশিকাও তৈরি করা হয়েছে।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ বাড়াতে ইন্টার্নশিপ ও চাকরি মেলার আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। উদ্ভাবনী অনুদানে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থী ঋণ এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময়ের উদ্যোগও রয়েছে।
‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচির আওতায় ২৯ হাজার ৬২১ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৮৮ হাজার ৮৬৩টি গাছ লাগানো হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ লাখ শিক্ষার্থীকে সম্পৃক্ত করে পাঁচ বছরে দুই কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের পোষা প্রাণী পালনে উৎসাহিত করতে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পোষা প্রাণী ক্লাব গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
‘স্টার্টআপ বিজ্ঞান প্রকল্প ও উদ্ভাবনী ধারণা প্রদর্শনী’র মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নতুন উদ্ভাবনে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে ‘উদ্ভাবনী মেধাবী শিক্ষার্থী’ এবং ‘সুশিক্ষায় মেধাবী শিক্ষক’ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। সংসদ টেলিভিশনকে শিক্ষা চ্যানেলে রূপান্তরের বিষয়েও আলোচনা চলছে।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর গত ১৫ আগস্ট থেকে বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ ভাতা দেওয়া শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ২ হাজার ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ লাখ ২৩ হাজার শিক্ষককে এই ভাতা দেওয়ার কার্যক্রম চলছে।
অন্যদিকে এসএসসিতে শূন্য পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। এসব প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। জবাব সন্তোষজনক না হলে এমপিও বাতিলের সুপারিশ করা হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক অধ্যাপক ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রাক্তন পরামর্শক ড. ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, ছয় মাসের কার্যক্রম দিয়ে একটি মন্ত্রণালয়ের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা কঠিন। তাঁর মতে, নকল বন্ধে কঠোরতা এবং শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি ছিল।
তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের এমপিও তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল না করে শিক্ষকদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য দুই থেকে তিন বছর সময় দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
কারিগরি শিক্ষার প্রসঙ্গেও তিনি বলেন, শুধু পাঠ্যবই সরবরাহ করলেই এ খাতের উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করতে হবে। এরপর প্রয়োজন হবে ল্যাব, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং দক্ষ প্রশিক্ষকের। সাধারণ, বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে এলাকাভিত্তিক চাহিদা নির্ধারণ করে অগ্রাধিকার ঠিক করার কথাও বলেন তিনি। তাঁর মতে, হাতে-কলমে শিক্ষার সুযোগ না থাকলে বড় ধরনের বিনিয়োগেরও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাবে না।
সব মিলিয়ে সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে শিক্ষা খাতে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব পরিকল্পনার কতটা বাস্তবে কার্যকর হয় এবং তার সুফল কতটা শ্রেণিকক্ষে পৌঁছায়, তার ওপরই শিক্ষা সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করবে।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন