কর ফাঁকি দিয়ে উৎপাদিত নকল ও চোরাচালানের সিগারেটের কারণে প্রতিবছর সরকারের প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। এই ক্ষতি কমাতে আগামী অর্থবছর থেকে ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ প্রযুক্তি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে বছরে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তামাকজাত পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় কঠোর নজরদারি এবং রাজস্ব ফাঁকি বন্ধে কয়েকটি নতুন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। এসব উদ্যোগের মধ্যে ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ প্রযুক্তি অন্যতম।
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন থেকে সরবরাহ পর্যন্ত তামাকপণ্যের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। কারখানাগুলোতে উৎপাদনের হিসাব রাখতে কাউন্টিং ডিভাইস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির আধুনিক ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সিগারেটের স্ট্যাম্পে কিউআর বা এআর কোড যুক্ত করা হবে।
অবৈধ সিগারেটের তথ্য সংগ্রহে হুইসেলব্লোয়ার ব্যবস্থাও চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষ যাতে অবৈধ সিগারেট সম্পর্কে তথ্য জানাতে পারেন, সে জন্য একটি বিশেষ মোবাইল অ্যাপ তৈরি করা হবে। তথ্যদাতাদের পুরস্কৃত করার ব্যবস্থাও থাকবে।
এদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে সিগারেটের দাম নির্ধারণ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। এক পক্ষ আরও মূল্যবৃদ্ধির পক্ষে মত দিচ্ছে। অন্যদিকে বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এবং অবৈধ সিগারেটের বিস্তারের ঝুঁকি বিবেচনায় সরকারের প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগকে বাস্তবসম্মত বলছেন কেউ কেউ।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনসাইট মেট্রিক্সের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট সিগারেট বাজারের ১৩ থেকে ১৮ শতাংশ অবৈধ পণ্যের দখলে। এর ফলে বছরে সরকারের প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারানোর কথা বলা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বৈধভাবে বিক্রি হওয়া সিগারেটের পরিমাণ ছিল ৮৪ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন শলাকা। পরের অর্থবছরে তা কমে ৬৫ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন শলাকায় নেমে আসে। এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ১৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন শলাকার যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তার বড় অংশ অবৈধ বাজারে চলে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এনবিআরের গত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণেও সিগারেটের মূল্যবৃদ্ধির চিত্র পাওয়া যায়। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম গড়ে ১১ দশমিক ৪ শতাংশ, মধ্যস্তরের ৬ দশমিক ২ শতাংশ এবং উচ্চ ও প্রিমিয়ামস্তরের সিগারেটের দাম ৮ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের প্রায় ৭০ শতাংশ ধূমপায়ী নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর। ফলে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এই শ্রেণির ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ে। নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম বাড়লে তাদের একটি অংশ কম দামের নকল ও অবৈধ সিগারেটের দিকে ঝুঁকে পড়েন বলে সংশ্লিষ্টদের মত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের এক কর্মকর্তা জানান, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, শুধু কর বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি অবৈধ বাণিজ্য দমনে কার্যকর হতে পারে। মরক্কোসহ কয়েকটি দেশে ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ পদ্ধতি চালুর পর অবৈধ সিগারেটের বাজার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশেও প্রযুক্তিটি কার্যকরভাবে চালু করা গেলে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রাক-বাজেট আলোচনায় এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান স্ট্যাম্প ও ব্যান্ডরোল ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার কথা বলেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, স্ট্যাম্পের রং, আঠার প্রযুক্তি এবং নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আনা হবে, যাতে এগুলো সহজে নকল বা তুলে ফেলা সম্ভব না হয়।
তিনি আরও জানান, প্রতিটি সিগারেটের প্যাকেটে স্বয়ংক্রিয় কিউআর কোড বা একই ধরনের ডিজিটাল শনাক্তকারী কোড যুক্ত করা হবে। এর মাধ্যমে যে কেউ কোড স্ক্যান করে জানতে পারবেন সংশ্লিষ্ট পণ্যের বিপরীতে সরকারের রাজস্ব পরিশোধ করা হয়েছে কি না।
কর ফাঁকির প্রমাণসহ তথ্য দিলে তথ্যদাতার জন্য বড় অঙ্কের পুরস্কারের ব্যবস্থাও রাখা হবে বলে জানান আবদুর রহমান খান।
তিনি বলেন, উৎপাদনের পর্যায় থেকেই কোডিং ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে এবং কারখানা থেকে বাজার পর্যন্ত পুরো সরবরাহশৃঙ্খলকে ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনা হবে। অবৈধ সিগারেট উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিউজ বাংলা চ্যানেল